নিজস্ব প্রতিবেদক: শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি, কাস্টমসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবৈধ ট্রাক পারাপার এবং জাফলং লুটের মতো গুরুতর অভিযোগ। পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়ের করা মামলার ২ নম্বর ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনের নাকের ডগায় বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন রফিকুল ইসলাম শাহপরাণ। কেবল ঘুরে বেড়ানোই নয়, আদালত থেকে জামিন না নিয়েই তামাবিল স্থলবন্দর ও জাফলংয়ে রীতিমতো লুটপাটের একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি। এখন জনমনে একটাই প্রশ্ন? একজন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে গ্রেফতারে প্রশাসনের অদৃশ্য বাঁধা কোথায়?
সম্প্রতি এক লোকদেখানো সংবাদ সম্মেলন করে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো ঢালাওভাবে অস্বীকার করেন শাহপরাণ। তবে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবাদ সম্মেলনে দায়সারা বক্তব্য দিলেই লুটপাটের নথিবদ্ধ অপরাধ মুছে যায় না। কাস্টমসের ছাড়পত্র ছাড়াই ১৪টি বিশালাকার ট্রাক বের করে নেওয়া, এন্ট্রি ছাড়া ভারতীয় পণ্য খালাস এবং গেট পাসের নামে অবৈধ চাঁদাবাজির কোনো সদুত্তর তার লিখিত বক্তব্যে ছিল না। উল্টো নিজের অপকর্ম ঢাকতে এবং লুটপাটের রাজত্ব বহাল রাখতে স্থানীয় সাংবাদিকদের ম্যানেজ করে গোপন বৈঠক চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
একসময়কার কট্টর আওয়ামী সুবিধাভোগী এই শাহপরাণ ছিলেন বিগত সরকারের সাবেক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ও বর্তমানে কারাবন্দী ইমরান আহমদ চৌধুরীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন। সেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েই তিনি হয়েছিলেন জেলা পরিষদের সদস্য, করেছেন পাহাড়সম দুর্নীতি।
ত্যাগী বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের সময় জাফলং এলাকায় ব্যাপক লুটপাট চালায় শাহপরাণ ও তার নিজস্ব বাহিনী। এই ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর বাদী হয়ে মামলা করলে, পুলিশি তদন্ত শেষে দাখিলকৃত প্রতিবেদনে শাহপরাণকে ২ নম্বর আসামি হিসেবে এজারহারভুক্ত করা হয়। অথচ তাকে আইনের আওতায় না আনায় খোদ বিএনপির ভেতরেও তীব্র ক্ষোভ ও কানাঘুষার জন্ম দিয়েছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, কেবল সংবাদ সম্মেলনের আড়ালে কি গুরুতর অপরাধ ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অতীত ঢাকা সম্ভব? তামাবিল স্থলবন্দরের বিভিন্ন পয়েন্টে দৈনিক চাঁদাবাজির হিসাব, রাতের আঁধারে সীমান্তপথে চোরাচালান এবং বিগত সরকারের চিহ্নিত অপরাধীদের পুনর্বাসনের নেপথ্যে কারা সুবিধা পাচ্ছে, তা আজ স্বাধীন তদন্তের দাবি রাখে। সংবাদ সম্মেলনের পর অভিযুক্ত শাহপরাণের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি বারবার কল এড়িয়ে যান অথবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন, যা তার অপরাধের দিকেই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক মোড়ল গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় যেকোনো দখলদারি ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে দলমত নির্বিশেষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তামাবিলের মতো দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার এবং জাফলংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ আজ নির্দিষ্ট এক মাফিয়া সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। এর করুণ মাশুল গুণছেন সাধারণ ব্যবসায়ী ও খেটে খাওয়া পরিবহন শ্রমিক, পাশাপাশি রাষ্ট্র হারাচ্ছে বিপুল অংকের রাজস্ব। তাই সংবাদ সম্মেলনের অস্পষ্ট ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর না করে, দেশের রাজস্ব রক্ষা এবং সীমান্তে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অবিলম্বে যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে এক নিরপেক্ষ ও কঠোর সাঁড়াশি অভিযানের জোর দাবি জানিয়েছেন সিলেটের সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।